

আখেরী নবী সরকারে দো’আলম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নবুয়তে পরিসমাপ্তির পর সুশৃংখল পন্থায় এবং মানবিক মূল্যবোধ বিকাশের লক্ষ্যে মানুষের মুক্তির প্রয়োজনীয় উপাদান সমূহ সংরক্ষণ, অনুশীলন, নিয়ন্ত্রণ এবং মানবিক উন্নয়নের জন্য দ্বীন ইসলামের দিক নির্দেশনার দায়িত্ব পালন করছেন সত্যের মশালধারী সাহাবায়ে কেরাম, আলে রাসূল তথা আউলিয়ায়ে কামেলীনগণ।
সুদূর আরব থেকে আউলিয়া কেরাম এদেশে এই উদ্দেশ্যে জলপথে আসা আরম্ভ করেন আনুমানিক ৮০০ খৃষ্টাব্দে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে চট্টগ্রাম হয়ে ওঠে এতদঞ্চলের প্রবেশ-দ্বার। এই চট্টগ্রামের পাহাড়-পর্বত, সমুদ্রতট ইত্যাদি নৈসর্গিক সৌন্দর্য ও পরিবেশ আউলিয়া কেরাম ও সূফী সাধকদের আধ্যাত্ম সাধনার প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়। তাঁরা চট্টগ্রামের বর্তমান শহর এলাকা ও শহরতলীর বিভিন্ন স্থানে আস্তানা গড়ে তুলেন এবং মানুষের মাঝে ইসলাম ধর্মের শান্তির বাণী প্রচার করেন।
এরই ধারাবাহিকতায় সুদূর বাগদাদ শরীফ থেকে শেখ মোহাম্মদ ঘোরী ও তার অন্যতম সফরসঙ্গী গাউসুল আজম দস্তগীর এর আউলাদ এ পাক শামসুল আরেফীন সৈয়দ সুলতান আহমদ আল বাগদাদী (রহঃ) এবং কিছু সংখ্যক সফরসঙ্গীসহ দিল্লী সম্রাটের আমন্ত্রণে সুলতানী আমলে (ষোড়শ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়) এই উপমহাদেশে আগমন করেন। পরবর্তীতে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে চট্টগ্রামের বোয়ালখালী থানাধীন করলডেঙ্গা পাহাড়ের পাদদেশে বসতি স্থাপন করেন। যার বর্তমান নাম আহ্লা শেখ চৌধুরী পাড়া; যা ‘আহ্লা দরবার শরীফ’ নামে প্রসিদ্ধ।
তাঁর সাধনা, ইসলামের শিক্ষা ও তাসাওফের দীক্ষা দানের ফলে এতদঞ্চলের মানুষ সত্যপথ প্রাপ্ত ও খোদাতা’লার নৈকট্য লাভ করেন। ইসলামের মৌলিক নিয়ম-কানুন সুষ্ঠুভাবে শিক্ষাদান ও আমল করার জন্যে প্রয়োজন হয় একটি সুনির্দিষ্ট স্থান।
এই উদ্দেশ্যে হযরত শায়খ মোহাম্মদ গৌরী (রহ:) ষোড়শ শতাব্দীর শেষভাগে বর্তমান আহলা দরবার শরীফ প্রাঙ্গণে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। পরবর্তীকালে মানুষের সুবিধার্ধে তাঁর আমলেই এই মসজিদের দক্ষিণ পার্শ্বে একটি বিশাল দীঘি খনন করা হয়।

ইসলামের শান্তিবাণী প্রচার ও বিভিন্ন সমাজকল্যাণমূলক কাজের ফলে এবং তাঁর আধ্যাত্মিক কামালিয়াতের (পূর্ণতার) কারণে এতদঞ্চলের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠিভুক্ত মানুষ ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করেন। সপ্তদশ শতাব্দীর শুরুর দিকে হযরত শেখ মোহাম্মদ গৌরী (রহঃ) বেছাল প্রাপ্ত হন। তাঁর মাজার শরীফ ক্রমে আধ্যাত্মিক সাধনার পবিত্র স্থান হিসাবে উল্ল্যেখযোগ্য হয়ে উঠে।
কথিত আছে যে, দক্ষিণ এশিয়ার এই অঞ্চলে আগমনের পূর্বে হযরত শায়খ মোহাম্মদ গৌরী (রহ:) একবার পবিত্র হজ্জ্বব্রত পালন শেষে মদীনা মুনাওয়ারায় হুজুর নূর মোহাম্মদ (দ:)-এর রওযা শরীফ জিয়ারতে যান। জিয়ারতকালে রওযা মোবারক হতে তাঁর প্রতি নির্দেশ এলো ইসলাম প্রচারের জন্যে তিনি যেন দক্ষিণ এশিয়ার চট্টগ্রাম অঞ্চলে গমন করেন। এই নির্দেশ পাওয়ায় হুজুর পাক (দ:)-এর কাছ থেকে বিদায় নেয়ার সময় রওযা শরীফের পবিত্র গিলাফ মোবারক স্পর্শ করে ক্রন্দনরত অবস্থায় তিনি আরজি পেশ করেন, অজানা এই গন্তব্যের স্থানে ইসলামের প্রচার-প্রসার যেন তাঁর আওলাদে পাকগণের মাধ্যমে চিরস্থায়ী হয়। তাঁর এই ফরিয়াদ রাসূলে করিম (দ:)-এর দরবারে কবুল হয়।
সপ্তদশ শতাব্দীর শেষদিকের কোন এক সময় কাদেরিয়া তরিকার প্রতিষ্ঠাতা প্রখ্যাত সাধক গাউসুল আজম হযরত মহিউদ্দীন আবদুল কাদের জিলানী প্রকাশ হযরত গাউছে পাক (রহঃ) এঁর আওলাদে পাক শামসুল আরেফীন সৈয়দ সুলতান আহমদ আল বাগদাদী (রহঃ) সুদূর বাগদাদ শরীফ হতে এই পবিত্র স্থানে আগমন করেন এবং গভীর আধ্যাত্মিক সাধনায় নিমগ্ন হন।
ঐতিহ্যবাহী এলাকাটি ‘আহ্লা’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করার পেছনে এই মহান সুফীসাধক এর অনন্য রহস্যময় হেকমত জড়িত। জনশ্রুতি আছে যে, জরিপ অফিসারগণ এই এলাকায় এসে ধ্যানস্থ সাধক সৈয়দ সুলতান আহমদ আল বাগদাদী (রহঃ) এঁর দর্শ্ন লাভ করে। ‘আল্লাহ-আল্লাহ’ জিকিরে নিমগ্ন এই সাধকের দেহ তখন উইপোকার ঢিবি দিয়ে আচ্ছাদিত ছিল।
ভিন্নধর্মীয় ইংরেজ জরিপ অফিসারগণ জিকির সম্পর্কে অবগত নন বিধায় তারা মনে করলেন তিনি এই গ্রামের নাম ‘আল্লাহ’ বলেছেন। অতএব তারা গ্রামের নাম ‘আল্লাহ’ বলে লিপিবদ্ধ করলেন। পরবর্তী ‘আল্লাহ শব্দটি পরিবর্তন হয়ে অত্র এলাকাটি ‘আহলা’ নামে জরিপ রেকর্ড করা হয় এবং এ নামেই প্রসিদ্ধি লাভ করে।
বস্তুত যুগে যুগে তাঁর বংশপরস্পরায় আওলিয়া কেরামের বেলাদত (জন্ম) হয়েছে। এই মহান সাধক সপ্তদশ শতাব্দীর প্রারম্ভে বেসালপ্রাপ্ত হন। তাঁর বেসালের পরে তাঁর বংশধরদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য আওলাদগণ হলেন:
- হযরত শেখ দানু শাহ
- হযরত মনু শাহ
- হযরত শেখ শাহ
- হযরত মাওলানা সফর আলী (রহ.) সাহেব
- কুতুবে জমান, কুতুবুল আকতাব হযরত মাওলানা শাহ্ সুফী জনাব কাজী আসাদ আলী (রহ:)
- হাযত রওয়া, মুশকিল কোশা, সুলতানুল মোনাজেরীন, হযরতুল আল্লামা শাহ্ সুফী আবুল মোকারেম মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম নূরী বাবা (রহ:)
- পীরে কামেল, মোনাজেরে আহলে সুন্নাত, হযরতুল আল্লামা শাহ্ সুফী সৈয়দ আবু জাফর মোহাম্মদ সেহাবউদ্দিন খালেদ আল্ কাদেরী আল-চিশতী (রহঃ)
- আহলা দরবার শরীফের বর্তমান সাজ্জাদানশীন রাহাবারে ত্বরিকত
শাহ্ সুফী সৈয়দ আবরার ইবনে সেহাব আল-ক্বাদেরী আল-চিশতী (মাঃজিঃআ) সাহেব কেবলা
শাজরা শরীফ বলতে একটি সুফি তরিকার আধ্যাত্মিক বংশপরম্পরাকে বোঝানো হয়, যা সুফি পীর-মাশায়েখদের ধারাবাহিকতা অনুসরণ করে মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) পর্যন্ত পৌঁছে।