স্মরণঃ আহ্‌লা দরবার শরীফের প্রাণপুরুষ সৈয়দ আবু জাফর মোহাম্মদ সেহাবউদ্দীন খালেদ (রহঃ) ❤️

লেখক : অ্যাডভোকেট সাজ্জাদ হোসেন সিবলু, ফায়সালা, ৫ই এপ্রিল ২০১৯

দিঘীর অপর প্রান্ত থেকে রওজা

আহ্‌লা দরবার শরীফের পীরে কামেল, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রসেনার রূপকার, মোনাজেরে আহলে সুন্নত, হযরতুল আল্লামা শাহ্সূফী সৈয়দ আবু জাফর মোহাম্মদ সেহাবউদ্দীন খালেদ আল-ক্বাদেরী, আল- চিশতি (রহ:) পূর্ববর্তী যমানার আউলিয়ায়ে কেরামের ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের মুসলমান সমাজকে সঠিক পথের দিক-নিদের্শনা তথা হেদায়েত দান করেন, শরীয়ত ও ত্বরীকতের শিক্ষা দেন।

ইসলামের মূল রূপরেখা সুন্নীয়ত তথা আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের প্রচার – প্রসারে যাদের অবদান ও ত্যাগের কথা বিশ্বব্যাপী সমাদৃত এবং প্রশংসিত, তাদের মধ্যে হযরত মাওলানা শাহ্সূফী সৈয়দ আবু জাফর মোহাম্মদ সেহাবউদ্দীন খালেদ সাহেব ক্বেবলা (রহঃ) অন্যতম ।

জন্ম

হযরত শায়খ মোহাম্মদ গৌরি (রহ:), শাহ্ সুলতান আহমদ আল বোগদাদী, কুতুবে জামান জনাব কাজী আসাদ আলী সাহেব কেবলা (রহ:) এবং সুলতানুল মোনাজেরীন, ইমামে আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াত শাহ্সূফী আবুল মোকারেম মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম প্রকাশ নূরী বাবা (রহ:)’র পূণ্য স্মৃতি বিজড়িত এদেশের আধ্যাত্মিক জ্ঞান চর্চার অনন্য লীলাভূমি আহ্‌লা দরবার শরীফে ১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারি সুলতানুল মোনাজেরীন, ইমামে আহলে সুন্নত ওয়াল জামা’আত শাহ্সূফী আবুল মোকারেম মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম প্রকাশ নূরী বাবা (রহ:)’র ঔরশে পীরে কামেল, মোনাজেরে আহলে সুন্নত হযরতুল আল্লামা শাহ্সূফী সৈয়দ এ,জেড,এম সেহাবউদ্দীন খালেদ আল-ক্বাদেরী, আল্-চিত্তী (রহ:) জন্মগ্রহণ করেন ।

শিক্ষা

শৈশবকাল থেকেই হযরত সেহাব বাবা (রহ:)’র মধ্যে গভীর খোদাপ্রেম, আধ্যাত্মনুরাগ ও ভবিষ্যত মহত্বের সম্ভাবনা পরিলক্ষিত হয়। শিক্ষাজীবনে তিনি চট্টগ্রামের চন্দনপুরা দারুল উলুম মাদ্রাসা থেকে কামিল ও চট্টগ্রাম কলেজ থেকে রাজনীতি বিজ্ঞান বিষয়ে অনার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। তার শিক্ষা জীবনের একটি বৈশিষ্ট্য ছিলো যে, তিনি প্রত্যেক শ্রেণীতে প্রথম স্থান অর্জন করতেন। পিতার (হযরত নূরী বাবা) আধ্যাত্মিকতায় মজে জীবনের এক পর্যায়ে তার কাছে শিষ্যত্ব (বায়াত) গ্রহণ করেন।

কালক্রমে আহ্‌লা দরবার শরীফ ভিত্তিক সূফীতত্ত¡ চর্চা, ত্বরিকত প্রচার ও প্রসারের ঐতিহ্যকে তিনি আরো সুসংহত ও শক্তিশালী করেন। হযরত সেহাব বাবা (রহ:)’র আমলেই আহ্‌লা দরবার শরীফ ব্যাপক প্রতিষ্ঠা ও পরিচিতি লাভ করে। সম্পূর্ণভাবে ইসলামী জীবন যাপনের পাশাপাশি পীরের নির্দেশিত আধ্যাত্মিক সাধনায় ক্রমশ: তিনি আরও গভীরতায় নিমগ্ন হন ।

বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রসেনা প্রতিষ্ঠা

আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের আদর্শের আলোকে সুন্নীয়তকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে বাংলার জমিনে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রসেনা প্রতিষ্ঠার এই স্বপ্নদ্রষ্টার পরিকল্পনা এবং পরামর্শে ১৯৮০ সালের ২১ জানুয়ারি চট্টগ্রাম নগরীর দেবপাহাড়স্থ আহ্‌লা দরবার শরীফের খানকাহ্ শরীফে (খানকাহ্-এ-ক্বাদেরীয়া চিশতীয়া নূরীয়া) সর্বপ্রথম ১১ জন সদস্য নিয়ে তিনি সুন্নিয়তের একক অরাজনৈতিক সংগঠন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রসেনা প্রতিষ্ঠা করেন।

চট্টগ্রামের বাইরে অন্যান্য অঞ্চলেও সংগঠন বিস্তৃতি লাভ করার পেছনে তাঁর ব্যাপক ভূমিকা ছিল। তিনি ঢাকার এ্যালিফ্যান্ট রোডের সিটি সুপার মার্কেটে পরবর্তীতে জিন্নাত ম্যানসনে ছাত্রসেনার কেন্দ্রীয় অফিস স্থাপনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। পরবর্তীতে সেই সংগঠন সারা বাংলাদেশব্যাপী অহিংস ছাত্র রাজনীতির মডেল হিসেবে রূপ নেয়। পরবর্তীতে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রসেনার প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্যগণই বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট গঠন করেন।

পবিত্র ঈদ-এ-মিলাদুন্নবী (দ:) উদযাপন

এদেশের আধ্যাত্মিক জ্ঞান চর্চার অনন্য লীলাভূমী বীর চট্টলার প্রসিদ্ধ আহ্‌লা দরবার শরীফের অন্যতম ওলীয়ে কামেল, মোনাজেরে আহলে সুন্নত হযরত মওলানা শাহ্সূফী সৈয়দ আবু জাফর মুহাম্মদ সেহাবউদ্দীন খালেদ আল-ক্বাদেরী আল-চিশতী (রহ:) একদিকে যেমন ছিলেন ইসলামী শরীয়তের মহাবিজ্ঞ আলেম, তেমনি ছিলেন অত্যন্ত গভীর জ্ঞানী মুতাসাউয়ীফ তথা সূফী-বুযুর্গ। তাঁর খোদাভীরুতা ও নবীপ্রেম এবং আম্বিয়া-আউলিয়ার প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধা ছিলো বর্ণনাতীত। তিনি-ই নবীপ্রেমের নিদর্শনস্বরূপ এদেশের রাজধানীতে ১২ই রবিউল আউয়াল শরীফের মূল তারিখে জশনে জলূসের ব্যাপক আয়োজনের পথিকৃৎ। ১৯৮৯ সালে সৈয়দ মাওলানা আবু জাফর মোহাম্মদ সেহাবউদ্দীন খালেদ সাহেব ক্বেবলা (রহ:) নারায়ণগঞ্জে সম্মিলিত জুলুসে অংশগ্রহণ করেন।

পরবর্তীতে ১৯৯০ সালে ঢাকায় জশনে জুলুস আয়োজন করার যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত তিনি গ্রহণ করেন। ভক্ত আশেকদের মাঝে নবীপ্রেমের ঊর্মিমালা প্রবাহিত হতে থাকে। মূরশীদ কেবলার হাতে প্রতিষ্ঠিত ত্বরীকত ভিত্তিক আধ্যাত্মিক সংগঠন আঞ্জুমানে আসাদীয়া নূরীয়া সেহাবীয়ার পক্ষ থেকে ঈদে-মিলাদুন্নবী (দ:)-এর পক্ষে যাবতীয় শরঈ দলিলাদীর দুই পৃষ্ঠার একটি লিফলেট প্রকাশ করা হয়। উপরন্তু, পোস্টারও ছাপানো হয়, ব্যানার, ফেস্টুন এবং ঢাকা শহরে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে তোরণ করা হয়। মুর্শিদ কেবলা (রহ)’র তদারকীতে প্রশাসনের উচ্চ পর্যায় হতে সমস্ত কর্মসূচির অনুমতি নেয়া হয়।

তৎকালীন তাঁর খানকাহ শরীফ শ্যামলী থেকে জুলুস বের করে পুরো ঢাকা শহর প্রদক্ষিণ শেষে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে জশনে জুলুসের গুরুত্ব তুলে ধরে সারগর্ভ বক্তব্য রাখতেন এবং পরিশেষে মিরপুর মাজার শরীফে গিয়ে জুলুস সমাপ্ত করতেন। সেখানে যোহরের নামায শেষে মিলাদ-মাহফিল, মোনাজাত ও তবারক বিতরণ করা হতো। পূর্বাহ্নেই মীরপুর মাজার প্রাঙ্গণে প্রশাসনিক ভবনে এক রক্তদান কর্মসূচীর উদ্বোধন করা হয়।

বস্তুতঃ ঠিক সেই সময় সারাদেশে এই জুলুসের ব্যাপক প্রভাব পড়ে। রাজধানীতে ১২ রবিউল আউয়ালে জশনে জুলুসে ঈদ-এ-মিলাদুন্নবী (দঃ) পালিত হচ্ছে। কিন্তু ব্যাপক আকারে দৃষ্টিনন্দন আয়োজকের ভূমিকা পালন করে হযরত সেহাব বাবা (রহ:) ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছেন। বর্তমানে মুরশীদ কেবলা (রহঃ)’র সাহেবজাদা আহ্‌লা দরবার শরীফের সাজ্জাদানশীন রাহবারে তরীকত শাহ্জাদা শাহ্সূফী সৈয়দ আরার ইবনে সেহাব আল-ক্বাদেরী, আল-চিশতী (মা,জি,আ)’র পরিচালনায় রাজধানীতে সেই ঐতিহাসিক জশনে জুলস এবং ঈদ-এ-মিলাদুন্নবী (দ) আরো ব্যাপকভাবে উদযাপিত হচ্ছে।

সুন্নীয়ত এবং তরীকত প্রচার-প্রসার

হযরত সেহাব বাবা (রহ:) তার জাহেরী জীবনে ভ্রান্ত বাতিলপন্থীদের বিরুদ্ধে অসংখ্য মোনাজেরায় (সম্মুখ বিতর্কে অবতীর্ণ হন। শরীয়তের সংশ্লিষ্ট দলিলাদির মাধ্যমে তার বক্তব্য উপস্থাপনার সাবলিলতার সহজেই প্রতিপক্ষকে পরাভূত করে ইসলামের সঠিক পথে শামিল করেন। মানুষকে সত্যের সরলপথ প্রদর্শন করে সুন্নিয়তের মৌলিক ও বিতর্কিত বিষয়সমূহ ও আচার যথা নবুয়ত ও বেলায়তে বিশ্বাস, মিলাদ-কিয়াম, মাযার-রওয়া তা’যিম ও জিয়ারত, ওরশ মোবারক ও ফাতেহা পাঠ ইত্যাদি সম্পর্কে কুরআন, হাদীস, এজমা ও

কিয়াসের আলোকে বাহাসের মাধ্যমে সমাধান করে এতদঞ্চলে ইসলামে সত্যমত প্রতিষ্ঠায় তাঁর সময়কালে তাঁর মত দ্বিতীয় কোন মোনাজের ছিলেন না। বাতিলহীরা তাকে প্রচন্ড ভয় ও সমীহ করত। আল্লাহ এবং আল্লাহর হাবীব (দ) এর সকল আদেশ নির্দেশের সামগ্রিক ও নিঃশর্ত অনুসরণ, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত এর আদর্শের আলোকে দ্বীন ইসলামের সঠিক তথ্য মুসলিম সমাজে প্রচার প্রসারের লক্ষ্যে ২০০০ সালে আহ্‌লা দরবার শরীফে প্রতিষ্ঠা করেন দ্বীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আসাদীয়া নূরীয়া সেহাবীয়া দাখিল মাদ্রাসা। এ মাদ্রাসায় বর্তমানে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বহু ছাত্র-ছাত্রী অধ্যায়ন করছে। আল্লাহর অশেষ রহমতে বাবাজান কেবলা (রহ)’র স্থলাভিষিক্ত আহ্‌লা দরবার শরীফের বর্তমান সাজ্জাদানশীন শাহ্সুফী সৈয়দ আবরার ইবনে সেহাব আল-ক্বাদেরী, আল- চিশতী (মা.জি.আ) এর পরিকল্পনা এবং পরামর্শে আঞ্জুমানে আসাদীয়া নূরীয়া সেহাবীয়ার পরিচালনায় বর্তমানে এই মাদ্রাসায় বহুতল বিশিষ্ট আধুনিক ভবন নির্মাণের কাজ চলছে।

পাশাপাশি এতিমখানা চালু আছে এবং হেফজ বিভাগ চালুর পরিকল্পনাধীন । প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ত্বরিকত ভিত্তিক আধ্যাত্মিক সংগঠন আঞ্জুমানে আসাদীয়া নূরীয়া সেহাবীয়া, যেই সংগঠনের মাধ্যমে দেশব্যাপী ত্বরিকতের প্রচার-প্রসার ছাড়াও সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং মসজিদ মাদ্রাসা নির্মাণসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড পরিচালিত হয়। তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন খানকাহ্-এ-কাদেরীয়া চিশতীয়া নূরীয়া সেহাবীয়া।

এছাড়াও সারাদেশে মসজিদ, মাদ্রাসা, খানকাহ্ শরীফ প্রতিষ্ঠা করে সুন্নীয়তের প্রচারে তিনি যেই অবদান রেখেছেন তা আজীবন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এভাবে বলতে গেলে এদেশে সুন্নীয়তের প্রত্যেকটি কার‌্যক্রমে তাঁর বলিষ্ঠ ভূমিকা ছিল। বাস্তবিক পক্ষে এদেশের সুন্নীয়ত তথা ত্বরীকত পন্থীদের জন্য হযরত সেহাব বাবা (রহ:)’র অবদান সংক্ষিপ্ত পরিসরে লিখে শেষ করার মতো নয়। এদেশের সুন্নী মুসলমান আজীবন আল্লামা সৈয়দ আবু জাফর মোহাম্মদ সেহাবউদ্দীন খালেদ আল- ক্বাদেরী, আল-চিশতী (রহ) কে চিরদিন শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে।

বেছাল ও ওরশ শরীফ

আহ্‌লা দরবার শরীফের অন্যতম আধ্যাত্মিক প্রাণপুরুষ পীরে কামেল, মোনাজেরে আহলে সুন্নত হযরতুল আল্লামা শাহ্সূফী সৈয়দ আবু জাফর মোহাম্মদ সেহাবউদ্দীন খালেদ আল-ক্বাদেরী, আল-চিশতী (রহ:) সবাইকে শোকসাগরে ভাসিয়ে ২০১১ সালের ৫ এপ্রিল ২২ শে চৈত্র, মঙ্গলবার রাত সোয়া ৮টায় খোদা তা’আলার সাথে পরপারে বেছাল তথা মিলনপ্রাপ্ত হন। ২২শে চৈত্র ৫ এপ্রিল’ ২০১৯ইং শুক্রবার হযরত সেহাবউদ্দীন খালেদ (রহ:)’র ৮ম বার্ষিক ওরশ শরীফ আহ্‌লা দরবার শরীফ মহাসমারোহ অনুষ্ঠিত হবে। আঞ্জুমানে আসাদীয়া নূরীয়া সেহাবীয়া’র ব্যবস্থাপনায় ওরশ শরীফ পরিচালনা করবেন হযরত সেহাব বাবা (রহ:)’র স্থলাভিষিক্ত আহ্‌লা দরবার শরীফের সাজ্জাদানশীন শাহ্জাদা শাহ্সূফী সৈয়দ আরার ইবনে সেহাব আল-ক্বাদেরী, আল্-চিত্রী (ম.জি.আ)।

আরজঃ পরিশেষে একজন ভক্তের হৃদয়ের দৃষ্টিকোণ থেকে যা লিখেছি তাতে ভুল ত্রুটি বিচিত্র কিছু নয়। আমি সবার ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টি কামনা করছি। আল্লাহ তা’আলা আমার পীর ও মুর্শীদের ওসিলায় আমার এই প্রয়াসকে কবুল করলে আমি সফল হব, আমিন, সুম্মা আমিন !

বে-হুরমতে সাইয়েদিনা মুরসালিন সল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম।

(সংক্ষেপিত) তথ্য : সংগৃহীত।

Previous Article

সেমা মাহফিলের পক্ষে ১২টি দলিল

Next Article

তোহফায়ে রমজানুল মোবারক